বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পে নতুন উদ্ভাবনের দরজা খুলে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। তবে এ খাতে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ নিয়ে এখন পুঁজিবাজারে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে, যা বন্ডের বাজারকেও প্রভাবিত করছে। এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ এখন দ্বিধায় ভুগছে। বর্তমানে তাদের মধ্যে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টদের ইস্যুকৃত বন্ড বিক্রি করে দেয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে অ্যালফাবেট, মেটা, মাইক্রোসফট, ওরাকলসহ বিশাল ডাটা সেন্টার নির্মাণে যুক্ত হাইপারস্কেলার কোম্পানিগুলোর ইস্যু করা বন্ডের মূল্য সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় বড় ধরনের ধাক্কাও খেয়েছে। খবর এফটি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামগ্রিক অর্থে এআই অবকাঠামোর সম্ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঋণ ঝুঁকি ও আর্থিক খাতে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রশ্ন। এ কারণেই প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও অতিমূল্যায়নের আশঙ্কা এখন বন্ডবাজারে প্রভাব ফেলছে।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগের জন্য এখন বাজার থেকে ঋণ গ্রহণের দিকে ঝুঁকছে। ব্যাংক অব আমেরিকার তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তি জায়ান্টদের ইস্যুকৃত ঋণপত্র এখন মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের তুলনায় বেশি মুনাফা দিচ্ছে। মূলত অতিরিক্ত ঝুঁকির কারণেই এসব বন্ডের প্রিমিয়ামও এখন বাড়তির দিকে। এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার সময় ট্রেজারি বন্ড ও প্রযুক্তি কোম্পানির বন্ডের স্প্রেড বা ব্যবধান বেড়ে গিয়েছিল। সম্প্রতি এটি দশমিক ৭৮ শতাংশীয় পয়েন্টে পৌঁছেছে, যেখানে সেপ্টেম্বরে ছিল দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট।
ওয়েলিংটন ম্যানেজমেন্টের ফিক্সড ইনকাম পোর্টফোলিও ম্যানেজার ব্রিজ খুরানা বলেন, ‘গত দুই সপ্তাহে বাজার বুঝেছে, এআইয়ের উত্থানে শেষ পর্যন্ত পাবলিক ক্রেডিট মার্কেটকেই অর্থায়ন করতে হবে।’
জেপি মরগান বলছে, এআই কোম্পানিগুলোর পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করতে হবে। এ বিশাল বিনিয়োগে সব ধরনের মূলধন বাজার, বিকল্প ঋণদাতা, এমনকি সরকারকেও অংশ নিতে হবে। একাধিক কারণে এআই অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে এখন উদ্বেগ বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি ও দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক থাকা নিয়ে সংশয় এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা।
গুগল, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট ও মেটা আগামী বছর ডাটা সেন্টার নির্মাণ বাবদ ৪০ হাজার কোটি ডলারের বেশি খরচ করবে। চলতি বছরে কোম্পানিগুলোর এ বাবদ ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি ডলার।
বিনিয়োগকারীদের একাংশ আশঙ্কা করছে, বড় আকারের নগদ অর্থ হাতে থাকা সত্ত্বেও নতুন ঋণ নিচ্ছে এসব প্রযুক্তি কোম্পানি। বিষয়টি খাতটিতে ঋণনির্ভরতা বাড়িয়ে তুলতে পারে। জেপি মরগানের তথ্য অনুযায়ী, হাইপারস্কেলার কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত নগদ অর্থ ও বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি ডলার। ২০২৬ সালে তাদের পরিচালন আয় হবে আনুমানিক ৭২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। তা সত্ত্বেও কোম্পানিগুলো অর্থায়ন সংগ্রহে ঋণ বাজারে প্রবেশ করছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় মেটা, অ্যালফাবেট ও ওরাকল বড় অংকের বন্ড ইস্যু করেছে, যার মেয়াদ কিছু ক্ষেত্রে ৪০ বছর পর্যন্ত। গত মাসে পিমকো, ব্লু আউল ক্যাপিটালসহ অন্যান্য বিনিয়োগকারীর সঙ্গে ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের প্রাইভেট ঋণ চুক্তি করেছে মেটা। লুইজিয়ানায় হাইপেরিয়ন ডাটা সেন্টার নির্মাণের জন্য এ অর্থ সংগ্রহ করেছে তারা। অক্টোবরের শেষদিকে মেটা আরো ৩ হাজার কোটি ডলারের বন্ড ইস্যু করে, যা ২০২৩ সালের পর সবচেয়ে বড় করপোরেট বন্ড চুক্তি।
চলতি মাসের শুরুতে আড়াই হাজার কোটি ডলারের বন্ড বিক্রি করেছে অ্যালফাবেট। গত সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বন্ড বিক্রি করেছে ওরাকল। বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ওরাকলের বন্ড সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এফটির সংকলিত সূচক অনুযায়ী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ওরাকলের পুরনো বন্ডগুলোর দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। আইস ডাটা সার্ভিসেস অনুযায়ী, একই সময়ে মার্কিন হাই-গ্রেড টেক বন্ড সূচক ১ শতাংশের মতো কমেছে।
ওরাকলের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। ওপেনএআইয়ের মতো কোম্পানির সঙ্গে ইজারা চুক্তির কারণে তাদের ঋণের আকার দ্রুত বাড়ছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, এসব উদ্যোগ থেকে আগামী পাঁচ বছরে ৩০ হাজার কোটি ডলার আয় হতে পারে। তবে ঋণমান সংস্থা মুডি’স সতর্ক করে বলছে, প্রবৃদ্ধির জন্য অল্প কয়েকটি এআই কোম্পানির সঙ্গে বড় আকারের চুক্তির ওপর নির্ভর করছে ওরাকল। এতে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
এআই খাতে ছোট কোম্পানিগুলোর অবস্থাও খারাপ হচ্ছে। বড় কোম্পানিগুলো মুনাফা করলেও গত দুই সপ্তাহে ২০ শতাংশের বেশি শেয়ারদর হারিয়েছে ডাটা সেন্টার অপারেটর কোরউইভ। কোম্পানিটি বার্ষিক আয়ের পূর্বাভাস কমালে তাদের শেয়ারদর আরো ১৬ শতাংশ নেমে যায়।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, বড় আকারের বন্ড বিক্রির পর মূল্যের পতন ঘটা বাজারের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ারই অংশ। বেসপোক ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের ম্যাক্রো স্ট্র্যাটেজিস্ট জর্জ পিয়ার্কস বলেন, ‘এআই-সংক্রান্ত এ ঋণচক্রে এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছি আমরা। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা বাড়তি ঝুঁকির যথাযথ মূল্যায়ন করছি, এটা ভালো লক্ষণ। যদি অতিরিক্ত বন্ড সরবরাহের পর বাজারে দাম বেড়ে যেত, সেটি বরং বেশি চিন্তার বিষয় ছিল।’